আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শম্ভু মিত্রের চাঁদ বণিকের পালা নাটকের সনকা চরিত্র বিশ্লেষণ
Author: Susmita Sarkar
DOI: DOI: https://doi.org/10.70798/tgjct/010400047
সময়ের সাথে মানুষের চিন্তাধারা, জীবদর্শন, মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। এর প্রতিফলন সাহিত্যে স্পষ্ট। চর্যাপদের সাধন সংগীত থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় দেবী নির্ভর সাহিত্য আজ হতে উঠেছে মানুষ নির্ভর। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে শুরু হয়েছে দেবতামুক্ত মানুষের যাত্রা। এই সময়কার অর্থাৎ আধুনিক যুগের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো মানবতা, নারী জাগরণ ও বাস্তবতা। এই সাহিত্যে দেব-দেবী তুচ্ছ, মানুষ এবং মনস্তত্ত্বই প্রধান। প্রচলিত রীতিনীতি ভেঙে আধুনিক সাহিত্যিকরা বেদনাবোধ, বিচ্ছিন্নতাবোধ, অস্তিত্ববাদ এবং সমাজ সংস্কৃতির পরিবর্তনশীল রূপটিকেই ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের সাহিত্যে। তবে পুরাণকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ না করে নব রূপায়ণের প্রবণতা সাহিত্যিকদের মধ্যে বর্তমান। আধুনিক সাহিত্যিকরা পুরাণকেই অবলম্বন করে নতুন পুরাণ-নির্ভর সাহিত্য রচনায় ঝুঁকেছেন, যা অবশ্যই নতুন যুগের ভাবনায়, নতুন প্রেক্ষাপটে যুগোপযোগী করে। এই সাহিত্যিকদের হাতে পড়ে পুরাণের দেবদেবী স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে মর্ত্যে। পুরাণকথার পঞ্চকন্যার মতো নানা চরিত্রকে বর্তমান সময়ের আলোকে উপস্থাপন করে তাঁদের গভীর মনস্তত্ত্ব ও মানবিক দিকগুলি ফুটিয়ে তুলেছেন এযুগের সাহিত্যিকরা। নাটক, উপন্যাস, কাব্য, কবিতা—প্রায় সব ধারাতেই এই পুরাণের নব রূপায়ণ লক্ষণীয়। নাট্যকার শম্ভু মিত্রও তাঁর ‘চাঁদ বণিকের পালা’ নাটকটি এই ধাঁচেই রচনা করেছেন। বর্তমান বিপন্নতা থেকে মুক্তি পেতে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন দেশজ মিথের। মনসামঙ্গলের প্রচলিত চাঁদ সদাগরের কাহিনিকে ভেঙে তিনি কালের অন্ধকারে স্বকীয়তাবোধ ও শুভবোধের উদ্ভাসন ঘটিয়েছেন। মধ্যযুগের কাহিনি অবলম্বনে রচিত হলেও এই নাটক ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ নয়। মনসামঙ্গলের চাঁদ বণিকদের কাহিনি এখানে নিছক সংকট বা চম্পক নগরের কাহিনি নয়—এটি আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব সংকটের এক সংস্করণ। তাই তাঁর নাটকে সব চরিত্রই মধ্যযুগের পোশাক পরিহিত হলেও নিতান্তই আধুনিক মননধারী। এই অভিনব সনকা চরিত্রটির ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রযোজ্য। সনকা চরিত্রের প্রতিবাদ, বাস্তবতা, আত্মসন্ধান—সবই আধুনিকতার প্রতিভূ। তাঁর সংলাপগুলি মধ্যযুগের নারীর মুখের নয়, এক আধুনিক বাঙালি নারীর সংলাপ। এই নাটকটিতে চাঁদ চরিত্রটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আধুনিক দৃষ্টিতে সনকা চরিত্রটির গুরুত্বও অনস্বীকার্য।

